হারানো মাছের সন্ধানে

অলোক কুমার মিস্ত্রী

একটা সময় ছিল যখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের দেশে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-দিঘি, প্লাবন ভূমিতে বিপুল পরিমাণে ছোট মাছের আনাগোনা দেখা যেত। আমাদের ছোট বেলাতে ও মাছের বাজারে গেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ছোট মাছ বাজারে দেখা যেত। সে সময় মানুষ এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার প্রয়োজনবোধ করেনি। তখন খাড়ৈ ভর্তি হরেক রকম মাছ নিয়ে জেলে ঘরে ফিরত হাসিমুখে। অবশ্য সেই সোনালি দিনগুলো আজ শুধুই অতীত সর্বশেষ। মাছের আকালের দৃশ্য আজ স্পষ্টত ফুটে উঠেছে জেলেদের হাড্ডি শূন্য সার দেহের মলিন দশায়। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র এ নদীগুলো প্রবাহিত স্রোতসীনি অববাহিকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশের মৎস্য প্রজাতির বৈচিত্র্য গর্ব করার মতো ছিল। অবশ্য আজ ২০০৮ সালে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বর্ণিল রঙ, মনোহর আকার আর রসনা তৃপ্তির জন্য বিখ্যাত সেই ছোট মাছের অস্তিত্ব ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে_ মলা, ডেলা, চেলা,
চাপিলা, দাড়কিনা, বাতাসি, বাঁশপাতা, কাজলি, গুতুম, খরল্লা, রানী, তারাবাইন, খলিশা, পুঁটি, কাঁকিলা, কাঁচকি এ জাতীয় আরো নাম না জানা ছোট মাছ আর দেখা যায় না। গত কয়েক বছরে চরম বিপন্ন মাছের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হয়েছে বাচা, গাউরা, রিটা, দেশি সরপুঁটি, গোড়া মুইখ্যা, ভাঙনা ইত্যাদি ছোট মাছের নাম। এ ছাড়াও অনেক মাছের অস্তিত্ব বিপন্ন ও সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। ইতিমধ্যে আইইউসিএনের রিপোর্টে ৫৪টি বিপন্ন মাছের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি ছোট মাছ, যা আমাদের মৎস্য সম্পদের ছোট মাছের ক্ষেত্রে দুঃসংবাদও বটে। আর এ অবস্থার উত্তোরন ঘটাতে ইতিমধ্যে এসব মাছের আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এক সময় ছোট মাছের বিস্তৃৃতি ব্যাপক ছিল, যেখানে পানি সেখানে ছোট মাছ দেখা যেত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের বড় জলাশয় থেকে শুরু করে ছোট ছোট খাল-ডোবা সর্বত্রই ছিল ছোট মাছের বিচরণ। নদীনালা খালবিল পুকুর দিঘি ধানের জমি রাস্তার পাশের ডোবাতে ছোট মাছের প্রাচুর্য্য ছিল ব্যাপক। এসব মাছের মধ্যে পুঁটি, ট্যারা, মলা, ডেলা, পাবদা, চাঁন্দা, খলিশা, কাচকি, কৈ, টাকি, বেলে, ফলি, বাইন, গুলশা, সিং, মাগুরসহ অনেক মাছ, যা শুধুই স্মৃতি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদের আবাসস্থল ও রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য ভরাট করে ফেলেছে ছোট ছোট অনেক জলাশয়। উজানে পদ্মার ওপর নির্মিত ভারাক্কা বাঁধের কারণে অনেক নদী আজ নাম সর্বস্ব মানচিত্রে। বহু নদীর বুকে জেগে উঠেছে ধু ধু বালুময় চর। এ কারণে ছোট মাছের আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। এ ছাড়াও ফলনশীল শস্য ক্ষেতে সেচের জন্য বিভিন্ন জলাশয় থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে অতিরিক্ত পানি। তাই বর্ষাকালে পানি থাকলেও শীতকালে ও ভরা মৌসুমে এসব পানি শুকিয়ে যায়। এর ফলে শেষ হয়ে যাচ্ছে ছোট মাছের আবাসস্থল। আবার অনেক ঝিল-বিল শুকিয়ে সেখানে চাষাবাদ করা হয়েছে। এসব শস্য ক্ষেতে কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে পরবর্তী জলাশয়ে মিশছে। ফলে এসব জলাশয়ে ছোট মাছগুলোর বসবাস অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এভাবে ছোট মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। আজ ছোট মাছের জন্য বড় হুমকি হচ্ছে এদের আবাসস্থলগুলোর সংকোচন এবং নদী-নালা, খাল-বিলের বিপন্ন দশা। এর কারণ বন্যানিয়ন্ত্রণ, খাল খনন ও সেচ প্রকল্প এবং খাল নদী ভরাট করে ফেলা। ছোট মাছ বিপন্ন হওয়ার মূল কারণ খাল-বিল, নদ-নদী, ভরাট করে জনপদ গড়ে ওঠা। অপরিকল্পিত বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিলে কলকারখানার নিষিদ্ধ বর্জ্য মিশ্রিত পানির অবাধ প্রবেশ ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ নিধন, কারেন্ট জালের প্রভাব, বিদেশি মাছের ব্যাপক চাষ ও বিশ্বব্যাপি জলবায়ুগত পরিবর্তন ইত্যাদি। তাই মৎস্যবিদদের আর ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ছোট মাছ নিয়ে গবেষণা করার সময় এসেছে। এসব পরিবেশ থেকে এভাবে বিদায় নিলে ভয়াবহতা নিয়ে আসবে মৎস্য সম্পদে। তাই এদের আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্রে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s