মুখের ঘা থেকে ক্যান্সার

মুখের ঘা থেকে ক্যান্সার

ডা. মো. ফারুক হোসেন
ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন
সর্বপ্রথম পানের উৎপত্তি মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়ার পরপরই ভারত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পানের প্রচলন বিস্তার লাভ করেছে। ধূমপানের পাশাপাশি পান খাওয়া আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এমন একটি সময় ছিল যখন আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে পান দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন প্রায় ঐতিহ্যতে পরিণত হয়েছিল। বিয়ে বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার পর যিনি পান খান না তাকেও দেখা যায় এক খিলি পান মুখে রেখে আপন মনে চিবাতে থাকেন। আর একান্তই যিনি পান খান না তাকে দেখা যায় সুপারি বা পান মসলা চিবাতে থাকেন। এ পান-সুপারি চিবানোর পাশাপাশি রান্না কেমন হল, বর-কনেকে মানালো কি না ইত্যাদি আলাপচারিতা চলতে থাকে। অবস্থা এমন যে পান-সুপারি না খেলে অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্ব পরিপূর্ণতা লাভ করে না। পান-সুপারি নিয়ে অনেক জনপ্রিয় গান পর্যন্ত রয়েছে। যারা নিয়মিত পান খান তাদের দেখা যায়, পান খাওয়ার সময় এর নির্যাস বা রস ঠোঁট বেয়ে পড়ে যাচ্ছে আর কথা বলে যাচ্ছে। অনেক সময় পানের রঙিন নির্যাস ছিটকে এসে সামনে থাকা কারো মুখে পড়ছে বা পরিধেয় বস্ত্রতে এসে পড়ছে। এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কিছুই বলা যায় না, আবার সহ্যও করা যায় না। পান-সুপারি বা জর্দা নিয়ে অনেক কাব্য রচনা করা যাবে ঠিকই; কিন্তু এর ক্ষতিকর দিকগুলো অবশ্যই সবার জানা প্রয়োজন। এবার জেনে নেয়া যাক পান-সুপারি বা জর্দার রসায়ন এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলো। পানে রয়েছে কিছু টারফেনলস। পান খাওয়ার কারণে ঠোঁট ও জিহ্বাতে দাগ পড়ে যায়। দাঁতে প্রায় স্থায়ী দাগ পড়ে যায়। অনেকেই ভেবে থাকেন, জর্দা বা তামাক পাতা ছাড়া শুধু সুপারি দ্বারা পান সেবন করলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। সবার অবগতির জন্য জানা প্রয়োজন যে তাইওয়ানে অধিকাংশ মানুষ টোব্যাকো সামগ্রী ছাড়া সুপারি দিয়ে পান সেবন করে থাকেন। তাইওয়ানে গবেষণায় দেখা গেছে, সুপারি নিজেও ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে অর্থাৎ সুপারি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান। পানের সঙ্গে যে চুন বা চুনা খাওয়া হয় সেটি হলো ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা ক্যালসিয়াম
হাইড্রো-অক্সাইড। চুনে রয়েছে প্যারা অ্যালোন ফেনল যা মুখে আলসার বিক্রিয়া ঘটিয়ে এরিকোলিন নামক একটি নারকোটিক অ্যালকালয়েড উৎপন্ন করে। আবার অনেকের মতে, সুপারিতে এমনিতেই এরেকোলিন অ্যাকালয়েড বিদ্যমান থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এরিকোলিন প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রের উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এ কারণেই চোখের মণি সঙ্কুচিত হয় এবং লালার নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, চোখে পর্যন্ত পানি আসতে পারে। তবে এক খিলি পান-সুপারিতে এসব পরিবর্তন দেখা নাও যেতে পারে। কাঁচা সুপারি চিবালে উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। সুপারিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার সাইকোঅ্যাকটিভ অ্যালকালয়েড। এ কারণেই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কাঁচা সুপারি চিবালে শরীর গরম অনুভূত হয়, এমনকি শরীর ঘামিয়ে যেতে পারে। সুপারিতে রয়েছে এরিকেন ও এরকোলিন অ্যালকালয়েড যা উত্তেজনার দিক থেকে নিকোটিনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। অন্য অ্যালকালয়েডগুলোর মধ্যে রয়েছে_ এরিকাইডিন, এরিকোলিডিন, গুরাসিন বা গুয়াসিন, গুভাকোলিন ইত্যাদি।
সুপারি খেলে তাৎক্ষণিক যেসব সমস্যা দেখা যায় সেগুলো হলো_
ক্স অ্যাজমা বেড়ে যেতে পারে।
ক্স হাইপারটেনশন বা রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
ক্স টেকিকার্ডিয়া বা নাড়ির স্পন্দনের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে অস্থিরতা অনুভূত হওয়া। দীর্ঘমেয়াদে সুপারি সেবন করলে ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস হতে পারে। ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা বা স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা হতে পারে। মূলত আমাদের দেশে মুখের ক্যান্সারের মধ্যে স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশে পানের সঙ্গে সাদা পাতা বা জর্দা ব্যাপকভাবে গৃহীত হচ্ছে। জর্দা পছন্দমতো না হলে অনেকেই আবার মান-অভিমানও করে থাকেন। ক্যান্সার গবেষণায় আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএআরসির মতে, যারা পানের সঙ্গে তামাক জাতীয় দ্রব্যাদি গ্রহণ করেন তাদের সাধারণের চেয়ে ৫ গুণ বেশি আশঙ্কা থাকে ওরাল ক্যান্সারের রোগী হওয়ার ক্ষেত্রে। পানের সঙ্গে যে ধরনের তামাকসামগ্রী গ্রহণ করা হয় তা খুবই বিপজ্জনক। তুলনামূলকভাবে এরেকোলিন অ্যালকালয়েডের চেয়ে তামাকসামগ্রীর অ্যালকালয়েড ও নিকোটিনের অধিক মাত্রায় নেশা ও বিষাক্ত। তাই জর্দা যতো সুগন্ধি মিশ্রিত হোক না কেন, তা জীবনের সৌরভ ধীরে ধীরে বিলীন করে দেয়। পানের সঙ্গে যে খয়ের খাওয়া হয় তা লাল রঙের বলে পান খেলে খুব কম সময়ের মধ্যে মুখ লাল হয়ে যায়। খয়ের তৈরি করা হয় অ্যাকাসিয়া ক্যাটেচু নামক বৃক্ষের কাঠ থেকে। খয়ের এসট্রিনজেন্ট হিসেবে কাজ করে মুখের অভ্যন্তরের মিউকাস মেমব্রেনকে সঙ্কুচিত করে। অনেকেই বিচিত্র পদ্ধতিতে পান সেবন করে থাকেন। কেউ কেউ পানের ছোবড়া ও রস পর্যন্ত খেয়ে ফেলেন। পান খাওয়ার একপর্যায়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ পানের কিছু অংশ গালের একপাশে রেখে আবার কিছুক্ষণ পর খেতে দেখা যায় অনেকটা জাবরকাটার মতো। অনেকেই এভাবে পান গালের একপাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এদের ক্ষেত্রে গালের একপাশে আলসারসহ ক্যান্সার পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। পানের নেশা থেকে মুক্তি লাভের আশায় অনেকেই প্যাকেটজাত পান-মসলা কিনে চিবাতে থাকেন; কিন্তু ধারণাটি আসলে সম্পূর্ণ ভুল। পান-মসলাতেও ক্ষতিকর উপাদান বিদ্যমান যা মুখে আলসার সৃষ্টি করে থাকে। পান-মসলার সঙ্গে মেনথল মিশিয়ে মুখের অভ্যন্তরে ঠা-া অনুভূতির সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে। পানের নেশা ছাড়ানোর জন্য কিছু কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে যা ব্যক্তিবিশেষে কখনোই একই ধরনের হয় না। শুধু এটুকু বলা যায়, সব ধরনের নেশা থেকে মুক্তি পেতে আপনাকে সুন্দর জীবনবোধের অধিকারী হতে হবে। সুন্দর জীবনবোধের মাধ্যমে আপনিও পারেন সমাজকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s