ডেসটিনির লাখো ডিস্ট্রিবিউটরের আহাজারি

ডেসটিনির লাখো ডিস্ট্রিবিউটরের আহাজারি

রমনা পার্কের ভেতরে ডেসটিনির ডিস্ট্রিবিউটরদের একাংশ _সালাহউদ্দিন ভুলু

শেখ মাহমুদ এ রিয়াত

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কোম্পানি ডেসটিনি গ্রুপের লক্ষাধিক ডিস্ট্রিবিউটরের আহাজারিতে ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছে। দীর্ঘ সাত মাস ধরে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত মনুষ্যসৃষ্ট সংকটের কারণে যড়যন্ত্রের শিকার অভুক্ত ডিস্ট্রিবিউটর এবং ডেসটিনি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ৪৫ লাখ ক্রেতা-পরিবেশক গভীর আর্থিক সংকট থেকে রক্ষা পেতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার ডেসটিনি গ্রুপের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও ৪৫ লাখ ডিস্ট্রিবিউটরের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দাবিতে ডেসটিনির ৪৫ লাখ ক্রেতা-পরিবেশকের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ডেসটিনি ডিস্ট্রিবিউটর ফোরাম (ডিডিএফ) রাজধানীতে সকালে মানববন্ধন এবং পরে বিকাল ৩টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবি জানায়। আগামী ৭ দিনের মধ্যে এ দাবি পূরণসহ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ডিডিএফ।
প্রেসক্লাব থেকে রমনা পার্ক পর্যন্ত ডেসটিনির ডিস্ট্রিবিউটরদের আহাজারি
সকাল ৯টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ছিল ডেসটিনি ডিস্ট্রিবিউটর ফোরামের পূর্বনির্ধারিত শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি। নির্ধারিত সময়ের আগেই রাজপথে নিজেদের ক্ষুধার যন্ত্রণা আর ৭ মাসের অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ জীবনের করুণ অবস্থা জানাতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জড়ো হতে থাকে ডেসটিনির ডিস্ট্রিবিউটররা।
তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক দাবিটুকু জানাতে দেয়নি পুলিশ। ঘড়ির কাঁটা তখন কেবল সকাল ৯টা ছুঁই ছুঁই। রাজনীতির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডিস্ট্রিবিউটররা কর্মসূচিতে আসা শুরু করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে পূর্বঅনুমতি নিয়ে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে আসা ডেসটিনির ডিস্ট্রিবিউটরদের ওপর বিনা উস্কানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাঁদানে গ্যাস ও পুলিশের লাঠির পিটুনিতে হতভম্ব হয়ে যায় ক্ষুধার্ত মানুষগুলো। ডেসটিনির সাধারণ ও মহিলা ডিস্ট্রিবিউটর, সাংবাদিকসহ আহত হয়েছে অনেকেই। প্রেসক্লাব, হাইকোর্ট, পল্টন থেকে শুরু করে কাকরাইল, বিজয়নগর, দৈনিক বাংলার মোড়, মৎস্য ভবন এলাকায় তখন লাখ লাখ ডিস্ট্রিবিউটরের আহাজারি_ ‘আমরা তো কোনো বিশৃঙ্খলা করতে এখানে আসিনি। ৭ মাস ধরে যড়যন্ত্রের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতির কথা বলতে এসেছি, আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলতে চেয়েছি, তবে কেন শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে এ হামলা। আমাদের কষ্টের কথা বলার অধিকার কি আমাদের নেই? এ ঘটনার কারণে ইতিমধ্যে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে মানববন্ধনে প্রতিবাদ করতে আসা লক্ষাধিক ক্রেতা-পরিবেশক।
এরপর প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সোয়া ১০টা পর্যন্ত ডিস্ট্রিবিউটররা যে যেখানে পেরেছে সেখানেই বসে প্রতিবাদ করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় শাহবাগ, রমনা, পল্টন, মতিঝিল, কাকরাইল মোড়, প্রেসক্লাব, পল্টন মোড়, মৌচাক, ফকিরেরপুল, তোপখানা রোড, হাইকোর্ট এলাকা, সেগুনবাগিচা ও গুলিস্তান এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ করতে দেখা যায়।
অবশেষে রমনা পার্ক
এ পরিস্থিতিতে উভয় সংকটে পড়ে যায় পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিনা উস্কানিতে পুলিশ মানববন্ধনে বাধা না দিলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। তখন রাজধানীর ওইসব এলাকাজুড়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের আহাজারিতে উত্তপ্ত রাজধানীর আকাশ-বাতাস। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ ডিস্ট্রিবিউটর স্রোতের মতো ভেসে আসছে মানববন্ধনে যোগ দিতে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে পুলিশ প্রশাসন বিক্ষুব্ধ ডিস্ট্রিবিউটরদের রমনা পার্কের দিকে আসতে অনুরোধ জানায়। পরে রমনা পার্কে শুরু হয় অনির্ধারিত মহাসমাবেশ। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে লাখ লাখ ডিস্ট্রিবিউটর রমনা পার্কের মধ্যেই প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এ সময় মনুষ্যসৃষ্ট সংকটের কারণে গভীর আর্থিক সমস্যায় নিপতিত ডেসটিনি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ক্রেতা-পরিবেশকদের রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহায়তা কামনা করা হয়।
ক্রন্দনরত ডিস্ট্রিবিউটরদের আহাজারিতে উপস্থিত পুলিশ, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ হতবাক হয়ে যায়। উপস্থিত অনেকে মন্তব্য করেন_ কী এমন ঘটনা ঘটেছে যে, এতগুলো মানুষের পেটে লাথি মারা হল? কর্মসংস্থান সৃষ্টিই যদি সরকারের কাজ হয়, তবে লাখ লাখ মানুষ আজ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এদের দায়িত্ব কে নেবে?
সকাল ১১টা থেকে শুরু করে দুপুর আড়াই পর্যন্ত রমনা পার্কের ভেতর লাখ লাখ ডিস্ট্রিবিউটরের গগনবিদারী আর্তনাদে ওই এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল। তাদের দাবির মূল বিষয় ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আর তা হল যড়যন্ত্রের হাত থেকে ডেসটিনিকে রক্ষা করে লাখ লাখ মানুষের আয়ের পথ সুনিশ্চিত করা। এ সময় অনেক ডিস্ট্রিবিউটরের হাতে শোভা পাচ্ছিল দাবি আদায়ের প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা ছিল_ ‘ডেসটিনির বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার বন্ধ কর’, ‘ডেসটিনির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দাও’, ‘আগে ডেসটিনিকে জানুন পরে লিখুন’, ‘আমরা কেউ প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হইনি’, ‘যড়যন্ত্র বন্ধ কর, মিথ্যা মামলা প্রত্যহার কর’। অনেকের বুকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ও দেশের লাখ লাখ মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের রূপকার মোহাম্মদ রফিকুল আমীনের ছবি ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়।
সাংবাদিক ভাইরা দয়া করে সত্য কথা লিখুন
এ সময় ডিস্ট্রিবিউটররা সাংবাদিকদের দেখামাত্র বলেন, ভাই দয়া করে আর নেগেটিভ নিউজ করবেন না। আমরা ডেসটিনিতে কেউ প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হইনি। প্লিজ ডেসটিনি থেকে আমরা লাখ লাখ মানুষ যে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছি সে কথা লিখুন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান_ এভাবে আকুতি জানাতে থাকেন সাংবাদিকের কাছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ৭ মাস ধরে ক্ষতিগ্রস্ত ডেসটিনির লাখ লাখ ক্রেতা-পরিবেশক অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি পালন করে। সামান্যতম বিশৃঙ্খলা তারা করেনি। বরং পুলিশের মার খেয়েও হাসিমুখে নিজেদের কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চেষ্টা করেছে তারা।
এরপর ডেসটিনি ডিস্ট্রিবিউটর ফোরামের নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সহানুভূতির সঙ্গে তাদের এ দাবি দেখা হবে। এ মেসেজ আসার পরপরই পরিস্থিতি শান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে রমনা পার্ক ছেড়ে কর্মজীবনে ফিরে যায় ডেসটিনির লক্ষাধিক ক্রেতা-পরিবেশক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল লক্ষাধিক ডিস্ট্রিবিউটর মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেছিল। তবে ডেসটিনি ডিস্ট্রিবিউটর ফোরামের নেতৃবৃন্দ জানান, এ সংখ্যা আরো বাড়ত তবে সকালে পুলিশের বাধার কারণে অনেকেই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, ৭ মাস ধরে গণমাধ্যমের একটি অংশ তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে এমএলএম ব্যবসাকে অযথা নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে ডেসটিনির বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভুল বুঝে ডেসটিনির পরিচালনা পর্ষদসহ জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু যারা ডেসটিনির সঙ্গে এক যুগ ধরে কাজ করছে, সেই ৪৫ লাখ মানুষের মধ্যে একজন ব্যক্তিও ডেসটিনির বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি। এছাড়া ডেসটিনি গ্রুপের সকল ব্যাংক হিসাব বন্ধ থাকায় গত সাত মাস বেতন, ভাতা, কমিশন, কোনো কিছুই পায়নি ডেসটিনি কর্মীরা। এ কারণে সচ্ছল পরিবারগুলো ধীরে ধীরে দারিদ্র্যে ডুবে যাচ্ছে। ডেসটিনির কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি বিশেষ মহল ডেসটিনির ধ্বংসের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। তাদের লক্ষ্য যে কোনো মূল্যে ডেসটিনিকে নিশ্চিহ্ন করা। ৪৫ লাখ পরিবারের ২.৫ কোটি মানুষকে এই সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহনাভূতি কামনা করেছে তারা।

 

http://www.dainikdestiny.com/index.php?view=details&type=main&cat_id=1&menu_id=1&pub_no=435&news_type_id=1&index=0

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s