বনাঞ্চলের উদ্যোগ ৩০ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি_অরক্ষিত পাহাড়ি বনভূমি-১

বনাঞ্চলের উদ্যোগ ৩০ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি
অরক্ষিত পাহাড়ি বনভূমি-১

আল-ফারুক আযম

দখল ও উজাড় হচ্ছে পার্বত্যাঞ্চলের বনজসম্পদ। নানা কারণে সরকারের বনায়ন কর্মসূচিও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে আশার আলো নিয়ে এসেছে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বনায়ন কার্যক্রম। এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন তৈরি করেছেন দৈনিক ডেসটিনির পার্বত্যাঞ্চল ব্যুরো প্রধান আল-ফারুক আযম

পার্বত্যাঞ্চলে নতুন করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ দীর্ঘ ৩০ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক নোটিশে সরকার পার্বত্য খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় ২ লাখ ১৮ হাজার একর এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু
করে। তখন মহলবিশেষের ইন্ধনে সরকারি এ উদ্যোগ থমকে যায়।
বন বিভাগের সূত্রমতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলার রামপাহাড়ে ১৮৭১ সালে বার্মা থেকে সেগুন গাছের স্ট্যাম্প এনে সর্বপ্রথম পরীক্ষামূলকভাবে বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময়ে বনজসম্পদ রক্ষিত ছিল। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮১-৮২ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান এই বিশাল বনাঞ্চলের সিংহভাগই উজাড় হয়ে গেছে। নতুন বনায়ন কার্যক্রমও থমকে গেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট বনাঞ্চল ২৬ লাখ ৮৬ হাজার একর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৭ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫ একর। মোট বনভূমি ৩২ হাজার ২৫০ একর এবং রাষ্ট্রীয় অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চল (ইউসিএফ) ১৮ লাখ ৫৪ হাজার ২০০ একর। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৮৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এসব বনাঞ্চলের (নরমাল ফরেস্ট) গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময়েই সবচেয়ে বেশি বেআইনিভাবে গাছ কাটা হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের ৪ জানুয়ারি ইস্যুকৃত ১৯৯২ সালের ২১ মে বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। পার্বত্য খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় ২ লাখ ১৮ হাজার একর এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। তখন একটি মহলের বনায়ন কার্যক্রমের বিরোধিতা শুরু হলে বনায়ন কার্যক্রম বেশিদূর আগাতে পারেনি। পরে ১৯৯৬ সালের ১৮ জুলাই আবার বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৩ হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ দেওয়া হয়। তখন রাঙ্গামাটির রাজস্থলী ও কাপ্তাই এলাকা থেকে কয়েকশ অভিযোগ বন বিভাগে দাখিল করা হয়। আদালতে ৭০টি মামলা দায়ের করা হয়। আদালত ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে বন বিভাগকে স্থগিতাদেশ দেয়। সামাজিক বনায়ন পরিকল্পনার আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় সরকার দেশের অন্য জেলাগুলোর মতো পার্বত্য জেলায় নতুন করে বনায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৩৩৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৮৭ কোটি টাকা দেবে। বাকি টাকা দেবে এডিবি।
জানা যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য বন বিভাগ তিন পার্বত্য জেলা (খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরাবন) ৮০টি মৌজার ২ লাখ ১৮ হাজার একর ভূমিতে বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে পার্বত্য বান্দরবান জেলায় সিংহভাগই বনায়নের আওতায় আসে। জেলার ৬টি উপজেলার বনাঞ্চলের ভেতরে রয়েছে ২৫টি মৌজা। এর মধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ির ৩টি মৌজার ৪ হাজার ৮৪০ একর, আলীকদম উপজেলার ৩টি মৌজায় ৫ হাজার ৭৫৪ দশমিক ৯৮ একর, লামা উপজেলার ৩টি মৌজায় ২ হাজার ৭৮০ দশমিক ১৯ একর, রোয়াংছড়ি উপজেলার ১০টি মৌজায় ৪৩ হাজার ৯৮০ একর, রুমা উপজেলার ৩টি মৌজায় ৭ হাজার ৫০০ একর এবং বান্দরবান সদর উপজেলার ৩টি মৌজায় ৭ হাজার ৫০০ একর জমিতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় মোট ৭২ হাজার ৮০৫ দশমিক ১৭ একর ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমানেও সরকারি রিজার্ভ ফরেস্টে চলছে গাছ কাটার মহোৎসব। অনেক বন কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এদের মধ্যে বনখেকো সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গণি ছিলেন অন্যতম। বনদস্যু ও বেশকিছু অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে পাহাড়ের বনজসম্পদ উজাড় করে ফেলা হয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বনের মজুদ ১৯৬৪ সালে ২৩.৮ মিলিয়ন কিউবিক মিটার থেকে কমে ১৯৮৫ সালে ১৯.৮ কিউবিক মিটারে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশে বার্ষিক বন নিধনের হার ৩.৩ শতাংশ। পার্বত্যাঞ্চলে কয়েক দশক যাবৎ অব্যাহতভাবে বনজসম্পদ উজাড় করার ফলে ভূপৃষ্ঠের ওপরিভাগের পানি ইতিমধ্যে কমে গেছে। অসংখ্য ছড়া, ঝিরি বিলুপ্ত বা শুকিয়ে গেছে।
ওদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়লেও বেসরকারি উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিক বনায়নে এগিয়ে আসে। বিশেষ করে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন লিমিটেড, পিএইচপি গ্রুপ, এক্সিম গ্রুপ, মেরিডিয়ান গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ, ডেলটা গ্রুপ, গ্লাক্সো গ্রুপ, গাজী গ্রুপ, একে গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো, টাইগার ফার্ম, ডর্ম (এনজিও), জাবারাং (এনজিও), টিএমএসএসসহ (এনজিও) বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যক্তিরা বাণিজ্যিক বনায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে। বিভিন্ন গ্রুপ অব কোম্পানির বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিক বনায়নের বিরুদ্ধে মহলবিশেষের ইন্ধনে কতিপয় পত্রিকা উঠেপড়ে লেগেছে। মহলটি সরকারের বনায়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্তই করছে না, বেসকরারি উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক বনায়নের বিরোধিতা করছে। অথচ মহলবিশেষ পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজার হাজার একর রিজার্ভ ফরেস্ট উজাড়ের বিষয়ে নির্বিকার।
এ ব্যাপারে বান্দরবান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌফিকুল বারী জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের সামাজিক বনায়নে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর পেছনে যারা কাজ করছে তাদের অবিশ্বাসটিই মুখ্য। অন্য কোনো সমস্যা নেই। অনেকের ৫ একর জমি রয়েছে। কিন্তু দখলে ২০-৩০ একর। কারো কারো কাগজ নেই অথচ দখল করে বসে আছে একরের পর একর ভূমি। বন বিভাগ কিছু করতে চাইলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। সমতল ভূমিতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম চলে আসছে। যত সমস্যা পাহাড়ে। অথচ বন বিভাগের ল্যান্ড, বন বিভাগের ইনভেস্ট। এরপরও বিরোধিতা। এখানকার আদিবাসীদের ধারণা, বন বিভাগের বনায়ন কার্যক্রমে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হবে। তবে হাজার হাজার সাধারণ আদিবাসী ও বাঙালি সামাজিক বনায়নের পক্ষে। যত সমস্যা ওপরের (শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নেতাদের) দিকে। তবে আশার কথা হচ্ছে, বান্দরবানে লিজকৃত বনায়নে যথেষ্ট সফলতা এসেছে। রাবার গাছে উৎপাদন শুরু হয়েছে। ফল গাছে ফল ধরছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ব্যাপক বনায়ন কার্যক্রম চললেও সরকারিভাবে যত সমস্যা বনায়ন সৃজনে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s